যিশুখ্রিস্টের ‘শ্রাউড অব তুরিন’ নিয়ে নতুন গবেষণায় পাওয়া গেছে ভারতীয় উপমহাদেশের ডিএনএ। এই প্রাচীন লিনেন কাপড় কি ভারতে তৈরি? জানুন রহস্যঘেরা এই ঐতিহাসিক নিদর্শনের নতুন তথ্য।
খ্রিস্টান ধর্মের প্রবর্তক যিশু খ্রিস্টের দেহাবশেষ যে পবিত্র কাপড় দিয়ে জড়ানো ছিল বলে বিশ্বাস করা হয়, সেই ‘শ্রাউড অব তুরিন’ নিয়ে এবার নতুন তথ্য সামনে আনলেন গবেষকেরা। দীর্ঘ গবেষণার পর চাঞ্চল্যকর তথ্য জানা গেল। গবেষকরা বলছেন, ওই প্রাচীন লিনেন কাপড়ের তন্তুতে ভারতীয় উপমহাদেশের ডিএনএর সন্ধান পাওয়া গেছে। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান বিষয়ক জার্নাল বায়ো-আর্কাইভে সম্প্রতি প্রকাশিত গবেষণাপত্রে এ তথ্য উঠে আসে।
এ গবেষণাটি ‘শ্রাউড অব তুরিন’ নিয়ে বেশ কয়েক শতাব্দী প্রাচীন ঐতিহাসিক রহস্যকে নতুন করে উসকে দিল। অনেকে বলছেন, তবে কি ভারতেই তৈরি এই বিশেষ কাপড়?
কী এই ‘শ্রাউড অব তুরিন’
‘শ্রাউড অব তুরিন’ হলো ৪.৪ মিটার দীর্ঘ প্রাচীন লিনেন কাপড়, যাতে এক ক্রুশবিদ্ধ ব্যক্তির ঝাপসা প্রতিচ্ছবি দেখা গেছে। বহু খ্রিস্টান ধর্মালম্বী বিশ্বাস করেন, ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার পর যিশুখ্রিস্টের দেহ এই কাপড় দিয়েই ঢেকে দেওয়া হয়েছিল। এমনকি চতুর্দশ শতাব্দীতে ইউরোপে প্রথম এই বস্ত্রখণ্ডের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। তখন থেকেই এটি বিশ্বের অন্যতম আলোচিত এবং অমীমাংসিত ধর্মীয় স্মারক হিসেবে পরিচিত।
‘শ্রাউড অব তুরিন’ বর্তমানে ইতালির তুরিন শহরের ‘ক্যাথেড্রাল অব সেন্ট জন দ্য ব্যাপটিস্ট’– এ সংরক্ষিত রয়েছে। এটি খ্রিস্টধর্মের অন্যতম বেশি অধ্যয়ন করা নিদর্শন, যেখানে রক্তের দাগ ও ক্রুশবিদ্ধতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আঘাতের চিহ্ন রয়েছে বলে দাবি করা হয়।
গবেষণায় যা পাওয়া গেল
আধুনিক নেক্সট জেনারেশন সিকোয়েন্সিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে গবেষকেরা এই কাপড়ের ধূলিকণা এবং তথ্য পরীক্ষা করেন। আর সেখান থেকে সংগৃহীত ডিএনএ বিশ্লেষণে উঠে এসেছে চমকপ্রদ তথ্য। প্রথমত, কাপড়ের তন্তুতে এমন কিছু মানুষের ডিএনএ পাওয়া গেছে, যার জিনগত বৈশিষ্ট্য সরাসরি দক্ষিণ এশিয়া বা ভারতীয় উপমহাদেশের সঙ্গেই মিলে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, লিনেনের মধ্যে এমন কিছু উদ্ভিদের ডিএনএর সন্ধান মিলেছে, যেগুলো মূলত ভারতে উৎপাদিত হয়।
ইউনিভার্সিটি অব পাডোভার গবেষকদের মতে, শ্রাউড তৈরিতে ব্যবহৃত সুতা প্রাচীন ভারতের সিন্ধু উপত্যকা থেকে আসতে পারে। গবেষণার উপসংহারে বলা হয়, ‘এটি সম্ভবত ইন্দাস উপত্যকার নিকটবর্তী অঞ্চল থেকে লিনেন বা সুতা আমদানির সঙ্গে সম্পর্কিত ঐতিহাসিক যোগাযোগের ইঙ্গিত বহন করে।’
গবেষকেরা আরও জানান, দীর্ঘ সময় ধরে কাপড়টিতে বিভিন্ন প্রাণী, উদ্ভিদ ও মানুষের ডিএনএ জমা হয়েছে। শ্রাউডটিতে পাওয়া ডিএনএ উপাদানগুলো থেকে বোঝা যায়, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে কাপড়টির ব্যাপক ব্যবহার হয়েছে এবং সুতা ভারতে উৎপাদিত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের স্থানীয় লাল প্রবাল, চাষযোগ্য উদ্ভিদ এবং গৃহপালিত প্রাণী– যেমন শূকর, মুরগি ও কুকুরের উপস্থিতি শ্রাউডে জমে থাকা বিভিন্ন জৈবিক উপাদানের বৈচিত্র্য সম্পর্কে আকর্ষণীয় ধারণা দেয়।
গবেষকদের মতে, কাপড়টি ভারতে তৈরি হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। প্রাচীনকালে ভারত ছিল উন্নতমানের বস্ত্র উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র। আর কাপড়ে ভারতীয় উদ্ভিদের ডিএনএ মেলার কারণে মনে করা হচ্ছে, এটি তৈরিতে ব্যবহৃত কাঁচামাল হয়তো ভারত থেকেই নেওয়া হয়েছিল। আর হতে পারে কাপড়টি ভারতে বোনা হয়েছিল এবং প্রাচীন বাণিজ্য পথ ধরেই তা মধ্যপ্রাচ্য বা ইউরোপে পৌঁছায়।
শ্রাউডটির ইতিহাস শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে রহস্যে ঘেরা। এর উৎস নির্ধারণে বিজ্ঞানী ও গবেষকেরা একমত নন। জেনেটিক্স, প্রত্নতত্ত্ব, ফরেনসিক বিজ্ঞান এবং খ্রিস্টীয় অধ্যয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এর আগে ১৯৮৮ সালের কার্বন রেটিং পরীক্ষায় দাবি করা হয়, এই কাপড়টি ১২৬০ থেকে ১৩৯০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে মধ্যযুগীয় ইউরোপে তৈরি। ২০২৫ সালের একটি গবেষণা বলে, এটি কোনো মানুষের সংস্পর্শে তৈরি হয়নি, বরং এটি মধ্যযুগীয় ধর্মীয় শিল্পকর্ম হিসেবে তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান ডিএনএ বিশ্লেষণ সম্পূর্ণ অন্য কথা বলছে। ভারত ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্য, পূর্ব আফ্রিকা এবং ইউরোপের ডিএনএ মিশ্রণ থেকে স্পষ্ট প্রমাণ মিলছে, এই বস্ত্রখণ্ডের ইতিহাস অনেক বেশি পুরেনো। এটি কয়েক শতাব্দী ধরেই বিভিন্ন মহাদেশের মানুষের হাত বদলে আজকের অবস্থানে পৌঁছেছে।
তথ্যসূত্র: বায়ো-আর্কাইভ ও দ্য প্রিন্ট