1. gangchiltvip@gmail.com : admin :
কেশবপুরে বুরুলি খাল পুনঃখনন: ভবদহের জলাবদ্ধতা নিরসনে নতুন দিগন্ত - Gangchil TV
March 28, 2026, 3:17 pm

কেশবপুরে বুরুলি খাল পুনঃখনন: ভবদহের জলাবদ্ধতা নিরসনে নতুন দিগন্ত

Reporter name :
  • আপডেটের সময়: Saturday, March 28, 2026
  • 22 সময় দেখুন

কেশবপুরে বুরুলি খাল পুনঃখনন: ভবদহের জলাবদ্ধতা নিরসনে নতুন দিগন্ত


“শহীদ জিয়ার নাম সামনে আসবে বলেই খাল খননে উদ্যোগ নেয়নি বিগত সরকার”—প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত

 

 

জেমস আব্দুর রহিম রানা, যশোর:

যশোরের কেশবপুর—একটি নাম, যা শুধু একটি ভৌগোলিক পরিচয় নয়; বরং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার এক বেদনাদায়ক প্রতীক। আর এই সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বহু আলোচিত, বহুচর্চিত এবং মানুষের মুখে মুখে “মরণফাঁদ” হিসেবে পরিচিত ভবদহ এলাকা।

যশোর ও খুলনা জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত ভবদহ জলাবদ্ধতা সমস্যা বছরের পর বছর ধরে লাখো মানুষের জীবনে দুর্ভোগ ডেকে এনেছে। বর্ষা মৌসুম এলেই এই এলাকা যেন এক অদৃশ্য ফাঁদে আটকে পড়ে—যেখান থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজে পায় না মানুষ।

ঘরবাড়ি পানির নিচে, রাস্তাঘাট ডুবে যায়, স্কুল-কলেজ বন্ধ হয়ে পড়ে, আর কৃষকের মাঠ পরিণত হয় জলাশয়ে। অনেকেই বাধ্য হয়ে বসতভিটা ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হন।

স্থানীয়দের ভাষায়, “ভবদহ মানেই আতঙ্ক, মানেই অনিশ্চয়তা।”

এই বাস্তবতায় বছরের পর বছর ধরে এই অঞ্চলটি “যশোর-খুলনার মরণফাঁদ” হিসেবেই পরিচিতি পেয়েছে।

এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট নিরসনের লক্ষ্যেই এবার শুরু হয়েছে বহুল প্রতীক্ষিত বুরুলি খাল পুনঃখনন প্রকল্প, যা ভবদহ অঞ্চলের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে সচল করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের খাল পুনঃখনন কর্মসূচির আওতায় কেশবপুর উপজেলার ভবদহ এলাকার বুরুলি খালের প্রায় তিন কিলোমিটার অংশ পুনঃখননের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। শনিবার (২৮ মার্চ) সকাল ১০টায় বুরুলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকা ও বুরুলি মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত এক বৃহৎ জনসমাগমের মধ্য দিয়ে এই কাজের উদ্বোধন করা হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে উদ্বোধন করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। সভাপতিত্ব করেন যশোরের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. আশেক হাসান।

উদ্বোধনী বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা শুধু একটি স্থানীয় সমস্যা নয়—এটি একটি জাতীয় উদ্বেগের বিষয়। বছরের পর বছর ধরে এই অঞ্চল কার্যত একটি জলাবদ্ধতার ফাঁদে পরিণত হয়েছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে খাল পুনঃখননের কোনো বিকল্প নেই।”

তিনি বলেন, একসময় কপোতাক্ষ অববাহিকার খালগুলো প্রাকৃতিক ড্রেনেজ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। কিন্তু দখল, ভরাট এবং দীর্ঘদিনের অবহেলার কারণে সেগুলো অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ফলে বৃষ্টির পানি বের হওয়ার পথ না পেয়ে জমে থেকে সৃষ্টি করছে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা।

রাজনৈতিক প্রসঙ্গ টেনে প্রতিমন্ত্রী বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় খাল খনন কর্মসূচি একটি সফল উদ্যোগ হিসেবে স্বীকৃত ছিল। কিন্তু তার নাম সামনে আসার আশঙ্কায় বিগত সরকার এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নে আগ্রহ দেখায়নি।

তিনি আরও জানান, বর্তমান সরকার ভবদহ সমস্যাকে অগ্রাধিকার দিয়ে কপোতাক্ষ অববাহিকায় একটি সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। বুরুলি খাল পুনঃখনন সেই বৃহত্তর উদ্যোগের একটি অংশ, যা বাস্তবায়িত হলে ভবদহ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা অনেকাংশে কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন যশোরের পুলিশ সুপার রফিকুল ইসলাম, জেলা বিএনপির সভাপতি সাবেরুল হক সাবু, সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন, কেশবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেকসোনা খাতুন, উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবুল হোসেন আজাদসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা শুধু মৌসুমি সমস্যা নয়—অনেক জায়গায় বছরজুড়েই পানি জমে থাকে।

কৃষকরা জানান, জমিতে পানি জমে থাকায় ধান, পাটসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। অনেকেই চাষাবাদ ছেড়ে অন্য পেশায় যেতে বাধ্য হয়েছেন।

একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “আমাদের কাছে ভবদহ মানে জীবনসংগ্রাম। এখানে বাঁচাটাই কঠিন হয়ে যায় বর্ষা এলে।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবদহ সমস্যার সমাধানে খাল পুনঃখনন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও এটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হওয়া জরুরি।

তারা মনে করেন, খালগুলোকে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, দখলমুক্ত রাখা, নদীর সঙ্গে সংযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং আধুনিক পানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু না করলে এই “মরণফাঁদ” থেকে স্থায়ী মুক্তি পাওয়া কঠিন হবে।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বুরুলি খাল পুনঃখনন কাজ দ্রুত ও মানসম্মতভাবে সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। কাজের অগ্রগতি নিয়মিত তদারকি করা হবে।

উদ্বোধন শেষে প্রতিমন্ত্রী খালের পাড়ে একটি কৃষ্ণচূড়া গাছের চারা রোপণ করেন, যা পরিবেশ সংরক্ষণ ও সবুজ ভবিষ্যতের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এখন কেশবপুরসহ ভবদহ অঞ্চলের লাখো মানুষের দৃষ্টি এই খনন কাজের দিকে।

যশোর-খুলনার “মরণফাঁদ” খ্যাত এই জলাবদ্ধতা কি এবার সত্যিই ইতিহাস হয়ে যাবে?

নাকি আবারও ফিরে আসবে একই দুর্ভোগ?

এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে শুধু খননের ওপর নয়—বরং টেকসই ব্যবস্থাপনা, সঠিক পরিকল্পনা এবং কার্যকর বাস্তবায়নের ওপরই।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

এই বিভাগের আরও খবর