জেমস আব্দুর রহিম রানা, যশোর:
যশোরের মণিরামপুরে এক হৃদয়বিদারক সড়ক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের তিনজনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। গভীর রাতে প্রাইভেটকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশের একটি গাছের সঙ্গে সজোরে ধাক্কা লাগলে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান বাবা, ছেলে ও নাতনি। একই দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন পরিবারের আরও তিন সদস্য। একসঙ্গে তিনজনের মৃত্যুর খবরে ফাতেহাবাদ গ্রামসহ আশপাশের এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) ভোররাত প্রায় ৩টার দিকে যশোর–মাগুরা মহাসড়কের গাইদঘাট এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন, যশোরের মণিরামপুর উপজেলার ফাতেহাবাদ গ্রামের বাসিন্দা ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সাবেক পরিচালক আব্দুল মজিদ সরদার (৭০), তার ছেলে মাহমুদ হাসান জাকারিয়া জনি (৪৩) এবং জনির চার বছরের কন্যা সেহেরিশ।
দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন জনির মা মনোয়ারা বেগম (৬০), স্ত্রী সাবরিনা জাহান (৩০) এবং ছেলে সামিন আলমাস (১০)। তাদের প্রথমে যশোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নিহত ও আহতরা সবাই একই পরিবারের সদস্য। তারা প্রাইভেটকারযোগে চুয়াডাঙ্গায় আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন। সেখানে সময় কাটিয়ে গভীর রাতে তারা মণিরামপুরের নিজ বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেন। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে যখন তাদের গাড়িটি যশোর–মাগুরা মহাসড়কের গাইদঘাট এলাকায় পৌঁছায়, তখন হঠাৎ করেই প্রাইভেটকারটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশে থাকা একটি বড় গাছের সঙ্গে সজোরে ধাক্কা খায়।
সংঘর্ষটি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে প্রাইভেটকারটির সামনের অংশ দুমড়ে-মুচড়ে যায়। বিকট শব্দ শুনে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে ঘটনাস্থলে জড়ো হন। পরে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া হলে তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। গাড়ির ভেতর থেকে আহত ও নিহতদের উদ্ধার করে দ্রুত যশোর জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক মাহমুদ হাসান জাকারিয়া জনি, তার বাবা আব্দুল মজিদ সরদার এবং ছোট্ট সেহেরিশকে মৃত ঘোষণা করেন।
বারবাজার হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আলমগীর কবীর দুর্ঘটনার খবর পেয়ে রাতেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি জানান, ঘটনাস্থলে কোনো প্রত্যক্ষদর্শী না থাকায় দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, প্রাইভেটকারের চালক ক্লান্তি বা ঘুমের কারণে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতে পারেন। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে এবং এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
নিহত মাহমুদ হাসান জাকারিয়া জনি মণিরামপুর বাজারে একটি ইন্টারনেট ব্যবসা পরিচালনা করতেন। স্থানীয়ভাবে তিনি একজন পরিশ্রমী ও ভদ্র স্বভাবের মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার প্রতিষ্ঠানের কর্মী রিয়াদ হোসেন জানান, সোমবার জনি পরিবারের সবাইকে নিয়ে প্রাইভেটকারে করে চুয়াডাঙ্গায় নানাবাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন। রাতে সেখান থেকে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেন তারা। কিন্তু ফেরার পথেই ঘটে যায় এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা।
দুর্ঘটনার খবর দ্রুত এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে ফাতেহাবাদ গ্রামে নেমে আসে শোকের ছায়া। ভোর থেকেই নিহতদের বাড়িতে ভিড় করেন আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও পরিচিতজনরা। স্বজনদের আহাজারি আর কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো পরিবেশ। প্রতিবেশীরা জানান, আব্দুল মজিদ সরদার এলাকায় একজন সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন এবং তার ছেলে জনিও এলাকায় সবার কাছে পরিচিত ও মিশুক মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক হয়ে উঠেছে ছোট্ট সেহেরিশের মৃত্যু। পরিবারের সবার আদরের এই শিশুটি সব সময় তার হাসি আর দুষ্টুমিতে বাড়ির পরিবেশ মুখর করে রাখত। হঠাৎ এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় তার প্রাণহানির খবর শুনে অনেকেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।
রিয়াদ হোসেন জানান, দুর্ঘটনার পরপরই আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে নিহত তিনজনের মরদেহ রাতেই তাদের গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। পরিবারের ওপর নেমে আসা এই শোক যেন ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। একই দুর্ঘটনায় পরিবারের তিনজন সদস্য জীবন হারিয়েছেন এবং আরও তিনজন গুরুতর আহত হয়ে জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন।
এ ঘটনায় পুরো এলাকাজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এলাকাবাসী আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করছেন এবং নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করছেন। প্রশাসন জানিয়েছে, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।