শিক্ষার্থীরা সব আমার সন্তান’—অধ্যক্ষ তরিকুল ইসলাম
যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার খাজুরায় অবস্থিত মির্জাপুর আদর্শ মহিলা ডিগ্রি কলেজে নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতে অভিভাবক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার মানোন্নয়ন, নিয়মিত কলেজে উপস্থিতি, শৃঙ্খলাবোধ সৃষ্টি, ভালো ফলাফল অর্জন এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গঠনে অভিভাবকদের আরও সচেতন করার লক্ষ্যে এ সমাবেশের আয়োজন করা হয়। সমাবেশে অভিভাবকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ কলেজ কর্তৃপক্ষের উদ্যোগকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
শনিবার (১০ অক্টোবর) সকাল ১০টায় কলেজের অডিটরিয়ামে অনুষ্ঠিত এ সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন মির্জাপুর আদর্শ মহিলা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ তারিকুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিহাবুর রহমান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমান।
কলেজ সূত্রে জানা যায়, চলতি শিক্ষাবর্ষে মির্জাপুর আদর্শ মহিলা ডিগ্রি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ১৭২ জন ছাত্রী ভর্তি হয়েছে। তাদের অভিভাবকদের নিয়ে আয়োজিত সমাবেশে ১৭০ জন উপস্থিত ছিলেন। নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই অভিভাবকদের সঙ্গে শিক্ষকদের সরাসরি মতবিনিময়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও সার্বিক অগ্রগতি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সমাবেশে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠ প্রস্তুতি, বাড়িতে পড়াশোনার সময় নির্ধারণ, কলেজের নিয়মকানুন মেনে চলা, সময়ানুবর্তিতা, শৃঙ্খলা এবং শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার বিষয়ে আলোচনা করা হয়। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীরা কলেজে নিয়মিত উপস্থিত হচ্ছে কি না, পড়াশোনায় মনোযোগী হচ্ছে কি না এবং বাড়িতে তাদের পড়াশোনার পরিবেশ কেমন—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে অভিভাবকেরা শিক্ষকদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করেন। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার সমস্যা, সম্ভাবনা এবং ভালো ফলাফল অর্জনের উপায় নিয়ে মতবিনিময় হয়। অভিভাবকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন সুন্দর ও সুশৃঙ্খল করতে শিক্ষক ও পরিবারের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যক্ষ তারিকুল ইসলাম বলেন, “আমি এই কলেজের শুধু শিক্ষক নই, শিক্ষার্থীরা আমারও সন্তান। আমি চাই, আমার প্রতিটি সন্তান এ প্রতিষ্ঠান থেকে ভালোভাবে লেখাপড়া শিখে যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে উঠুক। তারা যেন ভবিষ্যতে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার পাশাপাশি পরিবার, সমাজ ও দেশের জন্য অবদান রাখতে পারে, সেটিই আমাদের প্রত্যাশা।”
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফল অর্জনের পাশাপাশি নৈতিকতা, শৃঙ্খলাবোধ ও দায়িত্বশীলতা শেখানোও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অন্যতম দায়িত্ব। এ লক্ষ্য পূরণে কলেজ কর্তৃপক্ষ নিয়মিতভাবে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও পড়াশোনার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করে। কোনো শিক্ষার্থী এক বা দুই দিন কলেজে অনুপস্থিত থাকলে তার খোঁজ নেওয়া হয়। প্রয়োজনে অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে অনুপস্থিতির কারণ জানার চেষ্টা করা হয়।
শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়ে তিনি বলেন, কলেজে মোবাইল ফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। শিক্ষার্থীরা যাতে পড়াশোনার প্রতি মনোযোগী থাকে এবং প্রতিষ্ঠানের নিয়মকানুন মেনে চলে, সে জন্য শিক্ষকরা সচেষ্ট রয়েছেন। শিক্ষার্থীদের চলাফেরা, আচরণ ও নিরাপত্তার বিষয়েও কলেজ কর্তৃপক্ষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে।
সন্তানদের পড়াশোনায় অভিভাবকদের নজরদারির আহ্বান
অধ্যক্ষ তারিকুল ইসলাম অভিভাবকদের উদ্দেশে বলেন, শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফলের জন্য শুধু কলেজের শিক্ষকদের ওপর নির্ভর করলে হবে না; বাড়িতেও সন্তানদের পড়াশোনার প্রতি অভিভাবকদের নিয়মিত নজর রাখতে হবে। সন্তান কখন পড়তে বসছে, কতক্ষণ পড়াশোনা করছে, নিয়মিত কলেজে যাচ্ছে কি না এবং পড়াশোনায় কোনো সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ে খোঁজখবর রাখতে হবে।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার পাশাপাশি সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক শিক্ষার্থী সকালে না খেয়ে কলেজে আসে। পরে কলেজে এসে অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাই সন্তানরা সকালে যথাসময়ে খাবার খাচ্ছে কি না, পর্যাপ্ত পানি পান করছে কি না এবং শারীরিকভাবে সুস্থ রয়েছে কি না, সেদিকে অভিভাবকদের বিশেষ নজর দিতে হবে। সুস্থ শরীর ও সুন্দর পরিবেশ শিক্ষার্থীদের মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করতে সহায়তা করে।
শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন রুটিন সম্পর্কে তিনি বলেন, সন্ধ্যায় মাগরিবের নামাজ আদায়ের পরপরই পড়ার টেবিলে বসার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। রাত ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে পড়াশোনা শেষ করে পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ভোরে ঘুম থেকে উঠে ফজরের নামাজের আগে বা পরে পড়াশোনায় সময় দেওয়ার অভ্যাস তৈরি করতে হবে। সকালে নাশতা খেয়ে যথাসময়ে কলেজের জন্য প্রস্তুত হয়ে বের হওয়ার অভ্যাসও গড়ে তুলতে হবে।
অধ্যক্ষ বলেন, অভিভাবকেরা যদি সন্তানদের প্রতি যত্নশীল হন এবং শিক্ষকরা নিয়মিত দিকনির্দেশনা দেন, তাহলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার মান আরও উন্নত হবে। শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতি কমবে, পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়বে এবং ভালো ফলাফল অর্জনের পথ সুগম হবে। এ জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষ ও অভিভাবকদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ এবং পারস্পরিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি।
শিক্ষক-অভিভাবকের সমন্বয়ে এগিয়ে যাবে শিক্ষার্থীরা
সমাবেশে বক্তারা শিক্ষার্থীদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গঠনে শিক্ষক ও অভিভাবকদের যৌথ ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁদের মতে, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান উন্নয়নে শিক্ষকদের পাঠদানের পাশাপাশি অভিভাবকদের সচেতনতা ও সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি। শিক্ষার্থীরা কলেজে কী শিখছে, বাড়িতে কীভাবে সময় কাটাচ্ছে এবং পড়াশোনায় কতটা অগ্রগতি করছে, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা গেলে তাদের দুর্বলতা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
তাঁরা বলেন, নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতে এ ধরনের অভিভাবক সমাবেশ আয়োজনের ফলে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ আরও সুদৃঢ় হয়। এতে শিক্ষার্থীদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা, পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ বাড়ানো এবং সুশৃঙ্খল শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন কলেজের সহকারী অধ্যাপক রুহুল কুদ্দুস, সহকারী অধ্যাপক সালমা পারভীন ও সহকারী অধ্যাপক কুশল কুমার চক্রবর্তী, শিক্ষক মোহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস, শাহনিমা আক্তার, জান্নাতুল ফেরদৌস, ময়না খাতুন, মোস্তফা কামাল, জাহাঙ্গীর হোসেন, এম. এম. মনিরুজ্জামান, মনিরুজ্জামানসহ কলেজের অন্যান্য শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের অভিভাবকেরা।
সমাবেশটি পরিচালনা করেন কলেজের সহকারী অধ্যাপক আবু সাঈদ।