1. gangchiltvip@gmail.com : admin :
অনলাইন ক্লাস নয়, বিদ্যুৎ অপচয় রোধ ও ব্যাটারিচালিত যান নিয়ন্ত্রণই হোক সংকট উত্তরণের পথ - Gangchil TV
April 25, 2026, 3:31 pm

অনলাইন ক্লাস নয়, বিদ্যুৎ অপচয় রোধ ও ব্যাটারিচালিত যান নিয়ন্ত্রণই হোক সংকট উত্তরণের পথ

Reporter name :
  • আপডেটের সময়: Saturday, April 25, 2026
  • 21 সময় দেখুন

 

।। জেমস আব্দুর রহিম রানা।।

 

দেশজুড়ে অব্যাহত লোডশেডিং, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং জ্বালানি সংকটের বহুমাত্রিক অভিঘাতে জনজীবন আজ কঠিন চাপে। শহর-গ্রাম নির্বিশেষে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ বিভ্রাট শুধু নাগরিক দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে না, কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা—সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এমন এক সময়ে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের যুক্তিতে অনলাইন-অফলাইন সমন্বিত ক্লাস পদ্ধতির চিন্তা সামনে আনা হয়েছে। উদ্দেশ্য হয়তো সাশ্রয়, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এটি কি সমস্যার মূল সমাধান, নাকি মূল সংকট আড়াল করে উপসর্গ সামলানোর প্রচেষ্টা?

বাস্তবতা বলছে, বিদ্যুৎ সংকটের বোঝা শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে শিক্ষাব্যবস্থাকে পরীক্ষামূলক নীতির আওতায় নেওয়া কোনো টেকসই সমাধান নয়। করোনাকালীন দীর্ঘ অনলাইন শিক্ষার ক্ষতি এখনো পুরোপুরি পুষিয়ে ওঠেনি। শিক্ষার গুণগত অবনতি, ডিজিটাল বৈষম্য, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং সামাজিক বিকাশের বাধাগুলো এখনও স্পষ্ট। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও বিভিন্ন গবেষণার তথ্য বহুবার দেখিয়েছে, গ্রামীণ বহু পরিবারে এখনো পর্যাপ্ত ডিভাইস, স্থিতিশীল ইন্টারনেট এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিত নয়। ফলে অনলাইন ক্লাসের প্রস্তাব অনেকের কাছে বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলেই প্রতীয়মান হয়।

বরং বিদ্যুৎ সংকটের প্রকৃত কারণগুলো চিহ্নিত করে সমাধান খোঁজা জরুরি। দেশে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও সঞ্চালন ঘাটতি, অপচয়, অবৈধ ব্যবহার এবং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা বড় সংকট হয়ে রয়েছে। বিশেষ করে আবাসিক সংযোগের অপব্যবহার এখন উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে।

গ্রামাঞ্চলে যে আবাসিক সংযোগ মূলত পারিবারিক ব্যবহারের জন্য, সেই একই সংযোগে ব্যাটারিচালিত ভ্যান, ইজিবাইক, মোটরভ্যান চার্জ দেওয়া হচ্ছে। অনেক জায়গায় ধান ঝাড়া মেশিন, কৃষিযন্ত্র, ছোট ওয়ার্কশপের যন্ত্রপাতি পর্যন্ত চলছে একই লাইনে। যেগুলো বাণিজ্যিক সংযোগের আওতায় থাকার কথা, সেগুলোর বড় অংশই নিয়ন্ত্রণহীনভাবে আবাসিক বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে। এতে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে এবং লোডশেডিং বাড়ছে।

এখানে ব্যাটারিচালিত যানবাহনের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশে কয়েক মিলিয়ন ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক, অটোরিকশা ও ভ্যান চলাচল করছে বলে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। প্রতিটি যান প্রতিদিন গড়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। সংখ্যার বিচারে এটি জাতীয় বিদ্যুৎ চাহিদার উপর দৃশ্যমান চাপ তৈরি করে। অথচ এই খাত এখনো পুরোপুরি নিবন্ধন, ট্যারিফ কাঠামো বা বিদ্যুৎ ব্যবহারের আলাদা নীতিমালার আওতায় আসেনি।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয়। তেলনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ প্রাকৃতিক গ্যাসভিত্তিক উৎপাদনের তুলনায় বহু গুণ বেশি। ফলে একদিকে ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ উৎপাদন, অন্যদিকে অপচয় ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার—এই দ্বৈত চাপ অর্থনীতির ওপরও প্রভাব ফেলছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন ওঠে, সাশ্রয়ের নামে শ্রেণিকক্ষ সীমিত করার আগে অপচয়ের উৎসগুলো কেন নিয়ন্ত্রণে আনা হবে না?

বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে ভোক্তার ওপর চাপ সৃষ্টি করা সহজ, কিন্তু কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া তাতে সংকট কমবে না। বরং প্রয়োজন আবাসিক সংযোগে বাণিজ্যিক ব্যবহার বন্ধে কঠোর অভিযান, ব্যাটারিচালিত যানের জন্য পৃথক বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ ট্যারিফ, চার্জিং স্টেশন নিবন্ধন, প্রিপেইড মিটার সম্প্রসারণ, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ এবং অপচয়রোধে জবাবদিহিমূলক মনিটরিং।

প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্ষেত্রেও সংস্কার জরুরি। আবাসিক গ্যাস ব্যবহারে প্রিপেইড মিটার বাধ্যতামূলক করা, শিল্প ও গৃহস্থালি খাতে অপচয় কমানো, সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো—এসবও জ্বালানি নিরাপত্তার অংশ। জ্বালানি সংকট কেবল উৎপাদনের সংকট নয়, এটি ব্যবস্থাপনারও সংকট।

এদিকে অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত রিকশা শুধু বিদ্যুৎ চাহিদা বাড়াচ্ছে না, অনেক শহর ও মফস্বলে ট্রাফিক শৃঙ্খলাও বিঘ্নিত করছে। সেক্ষেত্রে প্যাডেলচালিত রিকশা, সাইকেল এবং কম-শক্তিনির্ভর বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থাকে উৎসাহ দেওয়া সময়োপযোগী হতে পারে। এটি বিদ্যুৎ সাশ্রয়, পরিবেশ সুরক্ষা ও নগর ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

শিক্ষা খাতকে সংকট ব্যবস্থাপনার পরীক্ষাগার বানানো উচিত নয়। প্রয়োজনে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের সময়সীমা পুনর্বিন্যাস, শিফটভিত্তিক ক্লাস, খোলা পরিবেশে পাঠদান, কম বিদ্যুৎনির্ভর অবকাঠামো ব্যবহারের মতো বিকল্প ভাবা যেতে পারে। কিন্তু অনলাইন ক্লাসকে প্রধান সমাধান হিসেবে দাঁড় করানো বাস্তবতাবিবর্জিত।

একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার শিক্ষাব্যবস্থার শক্তির ওপর। সেই ব্যবস্থাকে দুর্বল করে জ্বালানি সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। বরং প্রয়োজন বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা, অপচয় রোধ, অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং বাস্তবভিত্তিক নীতি।

আজ সময়ের দাবি স্পষ্ট—অনলাইন ক্লাস নয়, আবাসিক বিদ্যুতের অপব্যবহার বন্ধ, ব্যাটারিচালিত যান নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় কঠোর সংস্কার এবং জনগণকেন্দ্রিক টেকসই পদক্ষেপ। কারণ বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের সবচেয়ে কার্যকর পথ শিক্ষার্থীর শ্রেণিকক্ষ বন্ধ করা নয়; অপচয়ের চাকা থামানো।

নীতি নির্ধারকদের মনে রাখতে হবে—একটি প্রজন্মের স্বপ্ন কোনো পরীক্ষামূলক নীতির বলি হতে পারে না।

— লেখক: জেমস আব্দুর রহিম রানা, সিনিয়র গণমাধ্যমকর্মী, সাহিত্যিক ও কলামিস্ট।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

এই বিভাগের আরও খবর