ইসরাইলি গণহত্যা সমর্থন
অস্ট্রেলিয়ায় আজ পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপন হচ্ছে। দেশটির রাজধানী সিডনির একটি মসজিদে পবিত্র রমজান মাস শেষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ বেশ কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তাকে নিয়ে সেখানে হাজিরও হয়েছিলেন, কিন্তু মুসুল্লিদের তোপের মুখে তাকে বেরিয়ে যেতে হয়েছে।
স্থানীয় সময় শুক্রবার (২০ মার্চ) সকালে সিডনির লাকেম্বা মসজিদে (অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম বৃহত্তম মসজিদ) আয়োজিত ঈদুল ফিতরের নামাজে অংশ নিতে কমিউনিটি নেতাদের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন।
অনুষ্ঠানে মসজিদের একজন নেতা যখন সরকারের পক্ষ থেকে মুসলিম অস্ট্রেলীয়দের সঙ্গে আরও জোরালো যোগাযোগের আহ্বান জানিয়ে বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তখন উপস্থিত বেশ কিছু মুসল্লি এই দুই নেতাকে ‘গণহত্যা সমর্থক’ বলে অভিযুক্ত করেন এবং ‘ভু’ ধ্বনি দিয়ে ‘এখান থেকে চলে যান’ বলে চিৎকার করতে থাকেন।
গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসন নিয়ে অস্ট্রেলীয় সরকারের অবস্থান এবং নিজ দেশে ক্রমবর্ধমান ইসলামোফোবিয়া (ইসলামবিদ্বেষ) নিয়ে দেশটির মুসলিম সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশের মধ্যে গভীর ক্ষোভ বিরাজ করছে।
নিউজ এজেন্সি ‘অস্ট্রেলিয়ান অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস’-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী অ্যালবানিজের দিকে চিৎকার করা এক ব্যক্তিকে পুলিশ মসজিদ থেকে সরিয়ে দিলেও পরে কোনো অভিযোগ ছাড়াই ছেড়ে দেয় এবং এলাকা ত্যাগ করতে বলে।
বক্তব্য শেষ হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী ভিড়ের মধ্য দিয়ে মসজিদ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময়ও বেশ কয়েকজন তার দিকে চিৎকার করতে থাকেন। একজন প্রশ্ন করেন, ‘সে এখানে কেন? তাকে এখান থেকে বের করো! এটি একটি লজ্জা।’
অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পরপরই মসজিদ পরিচালনাকারী সংস্থা ‘লেবানিজ মুসলিম অ্যাসোসিয়েশন’ (এলএমএ) এক বিবৃতিতে জানায় যে, অ্যালবানিজকে নামাজের অনুষ্ঠানে স্বাগত জানানো হয়েছে এবং তারা তাদের দরজা সবার জন্য ‘উন্মুক্ত রাখা অব্যাহত’ রাখবে।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আমরা বুঝি যে মানুষের আবেগ এখন তুঙ্গে, বিশেষ করে গাজায় চলমান কষ্ট এবং লেবাননের ধ্বংসযজ্ঞের কারণে। আমাদের সম্প্রদায়ের জন্য এগুলো কোনো দূরের বিষয় নয়।’
এতে আরও বলা হয়, ‘তবে আমাদের পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। দেশের নির্বাচিত নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত হওয়া মানে এই উদ্বেগের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা নয়, বরং এভাবেই আমরা তাদের কাছে আমাদের দাবি পৌঁছে দিই।’
অ্যালবানিজ পরে গণমাধ্যমকে জানান, মসজিদে উপস্থিত ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষের অধিকাংশ তাকে স্বাগত জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য, মসজিদটি গত কয়েক মাসে বেশ কয়েকবার হুমকিমূলক চিঠির লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। ‘গার্ডিয়ান অস্ট্রেলিয়া’র মতে, তিনি বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে মানুষের প্রতিক্রিয়া ছিল অবিশ্বাস্যভাবে ইতিবাচক।’
তিনি ধারণা করেন যে, কিছু বিক্ষোভকারীর এই অসন্তোষের কারণ হতে পারে তার সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ, যার মাধ্যমে ‘হিজবুত তাহরীর’-এর মতো চরমপন্থী সংগঠনগুলোকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এর আগে, অ্যালবানিজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই সফর নিয়ে পোস্ট করেন এবং মুসল্লিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের হাস্যোজ্জ্বল ছবি শেয়ার করে লেখেন যে, এই প্রার্থনায় যোগ দেওয়া ছিল তার জন্য ‘সম্মানের’।
মসজিদে বক্তব্য দেওয়ার সময় কমিউনিটি নেতা গামেল খেইর উপস্থিত লোকজনকে বলেন, ‘আমরা পুরোপুরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে পারি না, আবার সস্তা ছবি তোলার সুযোগ দেওয়ার জন্য রাজনীতিবিদদের আমন্ত্রণ জানাতে পারি না।’
মসজিদ কর্তৃপক্ষ একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে আরও জানায় যে, ইসরাইল-গাজা সংঘাত শুরুর পর এই প্রথম প্রধানমন্ত্রীকে নামাজের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরাইল আক্রমণের পর থেকে অস্ট্রেলিয়ায় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা এবং ইহুদিবিদ্বেষ ও ইসলামোফোবিয়ার ঘটনা বাড়ছে। হামাস পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গাজায় ইসরাইলি হামলায় ৭২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে।
শুক্রবারের (২০ মার্চ) ঘটনাটিই প্রথম নয়; সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঈদের অনুষ্ঠানে রাজনীতিবিদরা মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হয়েছেন। সমালোচকদের মতে, ধর্মীয় উৎসবগুলোতে রাজনীতি জড়ানো উচিত নয়।
গত বছরের ফেডারেল নির্বাচন প্রচারণার সময়, লিবারেল পার্টির জেসন উড মেলবোর্নের একটি মসজিদে তোপের মুখে পড়ার পর তাকে পুলিশ পাহারায় বের করে আনা হয়েছিল।
অ্যালবানিজ সরকার, যারা গত বছরের শেষের দিকে যুক্তরাজ্য ও কানাডার সঙ্গে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছিল, গাজা সংঘাত এবং ডিসেম্বরে বন্ডি এলাকায় একটি ইহুদি অনুষ্ঠানে হওয়া গণগুলির ঘটনার পর থেকে সমালোচনার মুখে রয়েছে। ঐ গুলিবর্ষণে ১৫ জন নিহত হয়েছিলেন। আইএস আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে চালানো হামলাটি ছিল গত প্রায় তিন দশকের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে ভয়াবহ গণগুলির ঘটনা।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো সংস্থা এলএমএ এই অপ্রীতিকর পরিস্থিতির জন্য ক্ষমা চাইতে অস্বীকার করেছে। উল্টো তারা প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানোর সিদ্ধান্তের পক্ষ সমর্থন করে বলেছে যে, তারা তাকে সেখানে সুনির্দিষ্টভাবে নিয়ে এসেছিলেন যাতে তিনি সম্প্রদায়ের ‘ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ ও আশঙ্কার’ মুখোমুখি হন।