1. gangchiltvip@gmail.com : admin :
রক্তের মিনারে রাজনীতি: রাষ্ট্রের নীরবতা কি সম্মতি? - Gangchil TV
February 22, 2026, 11:12 pm

রক্তের মিনারে রাজনীতি: রাষ্ট্রের নীরবতা কি সম্মতি?

Reporter name :
  • আপডেটের সময়: Sunday, February 22, 2026
  • 38 সময় দেখুন

রক্তের মিনারে রাজনীতি: রাষ্ট্রের নীরবতা কি সম্মতি?

 

 

 

একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতির ইতিহাসে সেই দিন, যা কেবল স্মরণীয় নয়—এটি অন্তর্দাহ, আত্মপর্যালোচনা এবং দায়বোধের দিন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম, রাজনৈতিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন এবং আত্মপরিচয়ের ঘোষণাপত্র। সেই আন্দোলনের স্মারক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা শহীদ মিনার নিছক একটি স্থাপত্য নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক কম্পাস, জাতির বিবেকের আয়না। এখানে ফুল অর্পণ মানে কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করার এক নৈতিক অঙ্গীকার।

১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব যখন উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার উদ্যোগ নেয়, তখন পূর্ব বাংলার মানুষ বুঝতে পারে—এটি ভাষার প্রশ্নের আড়ালে রাজনৈতিক বঞ্চনার সূচনা। ভাষা মানে কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; ভাষা মানে ইতিহাস, সংস্কৃতি, সাহিত্য, চিন্তা ও চেতনার ধারক। ভাষাকে অস্বীকার করা মানে একটি জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয়কে অস্বীকার করা। এই বোধ থেকেই প্রতিবাদ শুরু হয়, ছাত্রসমাজ রাস্তায় নামে, নাগরিক সমাজ সংগঠিত হয়। আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি আসে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি, যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা রক্তাক্ত হয়ে ওঠে। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ অগণিত তরুণ বুক পেতে দেয় পুলিশের গুলির সামনে। তাদের আত্মত্যাগ কেবল একটি ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেনি; তা বাঙালির রাজনৈতিক চেতনায় এক অমোঘ জাগরণ ঘটিয়েছে।

এই রক্তস্নাত ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলা রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পায়। একুশের তাৎপর্য এখানেই থেমে থাকেনি। ভাষা আন্দোলনের চেতনা পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণায় রূপ নেয়, স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দেয়। ভাষার প্রশ্নে আপসহীনতার যে শিক্ষা একুশ দিয়েছে, তা আমাদের স্বাধীনতার ভিত্তি শক্ত করেছে। সেই ধারাবাহিকতায় একুশ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে ১৯৯৯ সালে, যখন ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এর মাধ্যমে ভাষার অধিকার কেবল জাতীয় নয়, বৈশ্বিক মানবাধিকারের প্রশ্নে পরিণত হয়।

এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পেছনে ছিল সুদূরপ্রসারী কূটনৈতিক উদ্যোগ ও রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার। বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য কেশবপুরের কৃতি সন্তান, তৎকালীন শিক্ষা মন্ত্রী এ এস এইচ কে সাদেক-এর নেতৃত্ব। মাতৃভাষা বাংলাকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তিনি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করেন এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে বিষয়টি উত্থাপনের পথ সুগম করেন। তাঁর প্রচেষ্টা প্রমাণ করে—সঠিক রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নীতিগত দৃঢ়তা থাকলে একটি জাতির সাংস্কৃতিক দাবি বৈশ্বিক স্বীকৃতি পেতে পারে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আজ কেবল বাংলাদেশের নয়; বিশ্বের সব ভাষাভাষী মানুষের মর্যাদা রক্ষার প্রতীক।

সম্প্রতি ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক অলি আহাদ-এর কন্যা রুমিন ফারহানা শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে অপমানিত হয়েছেন—এমন অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁর অর্পিত পুষ্পস্তবক ছিঁড়ে ফেলা হয়, অথচ একই সময়ে বর্তমান জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ এর আমীর ড. শফিকুর রহমান-এর পুষ্পস্তবক অক্ষত থাকে। আরও বিতর্ক তৈরি হয় যখন সেখানে ‘ভাষা সৈনিক’ হিসেবে গোলাম আজম-এর নামে স্লোগান দেওয়া হয়। ঘটনাগুলো কেবল রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার বহিঃপ্রকাশ নয়; এগুলো ইতিহাস-চর্চা, স্মৃতির রাজনীতি এবং ক্ষমতার প্রতীকী দখলদারিত্বের প্রশ্নও উত্থাপন করে।

ভাষা আন্দোলন ছিল পাকিস্তানি রাষ্ট্রচিন্তার একমাত্রিকতার বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক স্বাধিকারের সংগ্রাম। এই আন্দোলনের স্মৃতিবাহী প্রাঙ্গণে কারও প্রতি অবমাননা বা ইতিহাসের বিতর্কিত চরিত্রকে নতুন পরিচয়ে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা জনমনে স্বাভাবিকভাবেই প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ইতিহাসের বিচার আদালতে যেমন হয়, তেমনি জনস্মৃতিতেও হয়। কারও অতীত অবস্থান বা বক্তব্য যদি ভাষা আন্দোলনের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে থাকে, তবে সেই অতীতকে অস্বীকার করে নতুন পরিচয়ের দাবি তুললে তা প্রশ্নের মুখে পড়বেই। ইতিহাসকে পাল্টে দেওয়ার চেয়ে ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে আত্মসমালোচনা করাই রাজনৈতিক পরিপক্বতার লক্ষণ।

শহীদ মিনার কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়। এটি রাষ্ট্রের, জাতির, প্রতিটি নাগরিকের। এখানে রাজনৈতিক মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু নৈতিক ঐকমত্য থাকা আবশ্যক। একুশের দিনে যদি প্রতিদ্বন্দ্বিতা, স্লোগানের সংঘর্ষ বা প্রতীকের দখল নিয়ে প্রতিযোগিতা দেখা যায়, তবে তা শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি অসম্মান। ভাষার জন্য জীবন দেওয়া মানুষরা কোনো দলীয় স্বার্থে নয়, জাতির মর্যাদার জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন। তাই শহীদ মিনারের প্রাঙ্গণে দলীয় শক্তি প্রদর্শন নয়, বিনয় ও আত্মসমালোচনাই হওয়া উচিত মূল সুর।

বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের জন্য এই পরিস্থিতি নিছক প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি একটি নৈতিক পরীক্ষা। গণতন্ত্রে সরকার মানে কেবল ক্ষমতার প্রয়োগ নয়, ন্যায় ও সমতার নিশ্চয়তা। ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত স্থানে যদি কোনো নাগরিক অপমানিত বোধ করেন বা পক্ষপাতের অভিযোগ ওঠে, তবে তা সরাসরি রাষ্ট্রের দায়। সরকারের নীরবতা কিংবা বিলম্বিত প্রতিক্রিয়া জনমনে সন্দেহের জন্ম দেয়। ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাতে হলে প্রথম শর্ত হলো নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।

এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা আছে—ইতিহাসের পুনর্বিন্যাসের প্রবণতা। রাজনৈতিক সুবিধার জন্য যদি ইতিহাসের বিতর্কিত অধ্যায়গুলোকে সরলীকরণ করা হয়, তবে তা সাময়িক সমর্থন আনতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে জাতির চেতনায় বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। ইতিহাসের জটিলতা স্বীকার করাই পরিপক্বতার লক্ষণ। একুশের শিক্ষা আমাদের বলে—সত্যকে এড়িয়ে যাওয়া নয়, সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ানোই সাহস।

গ্রামবাংলার মানুষ, যারা সাপ্তাহিক পল্লী কথা পত্রিকার মূল পাঠক, তারা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রশ্নে আবেগপ্রবণ হলেও বাস্তববাদী। তাঁদের কাছে একুশ মানে শহরের আনুষ্ঠানিক মিছিল নয়; এটি তাঁদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ, তাঁদের আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন। তাই শহীদ মিনারকে ঘিরে কোনো বিতর্ক তাঁদের হৃদয়ে সরাসরি আঘাত হানে। সরকারের উচিত এই জনমনের স্পন্দন অনুধাবন করা এবং দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া—স্বচ্ছ তদন্ত, দায়ীদের জবাবদিহি এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন।

একুশের প্রকৃত শিক্ষা হলো—ক্ষমতার চেয়ে নৈতিকতা বড়, কৌশলের চেয়ে সত্য শক্তিশালী। রাজনৈতিক মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু ভাষা ও সংস্কৃতির প্রশ্নে সর্বদলীয় ঐকমত্য থাকা উচিত। শহীদ মিনারকে দলীয় কর্মসূচির মঞ্চে পরিণত না করে জাতীয় ঐক্যের প্রতীকে রূপ দেওয়া সময়ের দাবি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে এমন পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যাতে একুশের অনুষ্ঠান হয় শালীন, সবার জন্য উন্মুক্ত ও নিরাপদ।

বিশ্বায়নের এই যুগে বহু ক্ষুদ্র ভাষা বিলুপ্তির পথে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ভাষার বৈচিত্র্য মানবসভ্যতার সম্পদ। মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা মানে অন্যের ভাষার প্রতিও সম্মান। একুশের চেতনা তাই কেবল জাতীয়তাবাদের সংকীর্ণ পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানবিক সহাবস্থানের দর্শন।

আজ প্রয়োজন একটি সর্বজনীন নৈতিক সংলাপ। রাজনৈতিক দলগুলোকে একুশের প্রশ্নে ন্যূনতম ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে। ক্ষমতাসীন সরকারের জন্য এটি আত্মসমালোচনার সুযোগ—ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা প্রমাণের সুযোগ। স্বচ্ছ তদন্ত, স্পষ্ট অবস্থান এবং প্রতীকের অপব্যবহার রোধে দৃঢ় পদক্ষেপ নিলে সরকার কেবল প্রশাসনিক দক্ষতা নয়, নৈতিক নেতৃত্বেরও পরিচয় দিতে পারবে।

শহীদ মিনারের সিঁড়িতে রাখা প্রতিটি ফুল নিঃশব্দে আমাদের জিজ্ঞেস করে—আমরা কি সত্যিই শহীদদের আত্মত্যাগকে ধারণ করছি? নাকি আমরা ইতিহাসকে কেবল রাজনৈতিক সুবিধার উপকরণে পরিণত করছি? এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার নয়। কারণ ইতিহাসের আদালতে কোনো সরকার, কোনো দল, কোনো ব্যক্তি চিরস্থায়ী নয়; চিরস্থায়ী কেবল সত্য ও আত্মত্যাগের মর্যাদা।

একুশ আমাদের আহ্বান জানায়—ভাষার মর্যাদা রক্ষা করতে, সত্যকে স্বীকার করতে, বিভেদের রাজনীতি পরিহার করতে। রাষ্ট্র যদি এই আহ্বানে সাড়া দেয়, তবে একুশ হবে শক্তির উৎস। আর যদি একুশের প্রাঙ্গণও প্রতিদ্বন্দ্বিতার মঞ্চে পরিণত হয়, তবে তা আমাদের সামষ্টিক ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে থাকবে।

শহীদ মিনার তাই আজও দাঁড়িয়ে আছে—নীরব, দৃঢ়, প্রশ্নমুখর। তার সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের প্রত্যেকেরই জবাব দিতে হয়: আমরা কি ক্ষমতার চেয়ে সত্যকে বড় ভাবি? আমরা কি দলের চেয়ে দেশকে বড় মানি? আমরা কি ইতিহাসকে সম্মান করি, নাকি তাকে ব্যবহার করি? একুশের উত্তর একটাই—সত্য, ন্যায় ও মর্যাদার পথে অবিচল থাকা। সেই পথেই রাষ্ট্রের মুক্তি, সেই পথেই জাতির ভবিষ্যৎ।

 

লেখক: জেমস আব্দুর রহিম রানা 

সিনিয়র গণমাধ্যমকর্মী, সাহিত্যিক ও কলামিস্ট।

মোবাইল: ০১৩০০৮৩২৮৬৮

ই-মেইল: ranadbf@gmail.com.

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

এই বিভাগের আরও খবর