জেমস আব্দুর রহিম রানা, যশোর:
যশোরের মণিরামপুরে চরমপন্থী নেতা রানা প্রতাপ বৈরাগীকে প্রকাশ্য স্থানে গুলি ও গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডে তিনজন অংশ নিয়েছিলেন এবং তিনটি পিস্তল ব্যবহৃত হয়েছে। ঘটনা তদন্তে পুলিশ চাঁদাবাজি, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব, নারীসংক্রান্ত বিষয় এবং চরমপন্থী গ্রুপের অভ্যন্তরীণ কোন্দল সবকটিই খতিয়ে দেখছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম এন্ড অপস) আবুল বাশার জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে দুটি চরমপন্থী গ্রুপের মধ্যে দ্বন্দ্বই হত্যার মূল কারণ। নিহত রানা প্রতাপ দীর্ঘদিন ধরে ভারত থেকে পরিচালিত চরমপন্থী গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টির ‘ক্যাডার’ হিসেবেও পরিচিত ছিলেন।
রানা প্রতাপ ২০০৫ সাল থেকে নিষিদ্ধ চরমপন্থী গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তখন তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে আরেক চরমপন্থী নেতা জিয়াউর রহমান জিয়ার সঙ্গে। কিন্তু বিগত কয়েক বছরে ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের কারণে তাদের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। মণিরামপুরের কপালিয়া বাজারে জিয়ার ‘বিসমিল্লাহ বরফমিল’ নামের প্রতিষ্ঠান থেকে বরফ কিনতেন রানা। ২০১৫ সালে নিজস্ব বরফকল স্থাপন করলে জিয়ার কাছ থেকে বরফ নেওয়া বন্ধ হয়। এতে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা বাকি ছিল। শ্রমিক নুরুজ্জামান বাবু জানান, আর্থিক বিষয়গুলোই মূলত তাদের মধ্যে দূরত্বের কারণ।
চরমপন্থার জীবন ছেড়ে রানা প্রতাপ স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছিলেন। তিনি কাটাখালি মৎস্য আড়ৎদার সমিতির সভাপতি এবং নড়াইল থেকে প্রকাশিত দৈনিক ‘বিডি খবর’ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন।
স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের সময় রানা প্রতাপ কপালিয়া বাজারের ‘ঝুম বিউটি পার্লার’-এ ছিলেন। পার্লারের মালিক ঝুমুর সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের ঘনিষ্টতা ছিল। পুলিশ জানায়, বিকেল ৫টার দিকে পার্লারে উপস্থিত থাকার পর পরিচিত কেউ তাকে বাইরে ডেকে বের হতেই তিনজন দুর্বৃত্ত তার ওপর গুলি চালায়। একজন প্রথমে লক্ষ্যভ্রষ্ট গুলি ছোড়ে, এরপর একজন গলা কেটে মৃত্যু নিশ্চিত করে। তৃতীয়জন রাস্তার মুখে দাঁড়িয়ে জনমনে ভীতি সৃষ্টি করে। এক যুবক এগিয়ে গেলে তার দিকেও গুলি করা হয়।
ঘটনার পরে ঝুম বিউটি পার্লারের মালিক ঝুমুর মন্ডলকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে নিয়েছে, যা পুলিশি তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ক্লিনিক মালিক হাদিয়া সুলতানা জানান, দুর্বৃত্তদের গুলিতে তার ক্লিনিকের কাঁচ ভেঙে যায়। পুলিশ গুলির খোসা উদ্ধার করেছে।
উল্লেখ্য, হত্যাকাণ্ডের অন্তত দুই ঘণ্টা আগে থেকে দুর্বৃত্তরা বাজারে অবস্থান করছিল। রানা প্রতাপ বৈরাগীর বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা, একটি বিস্ফোরক মামলা এবং একটি ধর্ষণ মামলা রয়েছে। তবে স্থানীয়রা বলছেন, তিনি বেশ কিছুদিন ধরে চরমপন্থার জীবন ছেড়ে সাধারণ জীবনে ফেরার চেষ্টা করছিলেন।
স্থানীয় ও পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, হত্যার সঙ্গে জেলহাজতে থাকা জিয়াউর রহমান ও অন্যান্য চরমপন্থী নেতাদের সম্পর্ক থাকতে পারে। ঝিনাইদহে আলোচিত আনার হত্যাকাণ্ডে জড়িত চরমপন্থী নেতা শিমুল ভূঁইয়া ও জিয়া বর্তমানে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন।
নিহত রানা প্রতাপের বাবা তুষার কান্তি বৈরাগী অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মণিরামপুর থানায় মামলা করেছেন। পুলিশ ঘটনার সমস্ত দিক যাচাই করছে এবং হত্যাকাণ্ডের পেছনের সমস্ত কারণ উদঘাটনের চেষ্টা করছে।