— জেমস আব্দুর রহিম রানার আত্মজীবনের জীবন্ত ইতিহাস
রাত যত গভীর হয়, পৃথিবী ততই নীরব হয়ে যায়।
এই নীরবতা কোনো শূন্যতা নয়—এটি এক গভীর আয়না, যেখানে মানুষ নিজের মুখোমুখি দাঁড়ায়। সেখানে ফিরে আসে না বলা কথা, চাপা কষ্ট, হারিয়ে যাওয়া মানুষ আর সময়ের ভেতরে হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিগুলো।
আমি সেই নীরবতার ভেতর দাঁড়িয়ে নিজের জীবনকে দেখি।
এটি কোনো সাজানো গল্প নয়—এটি কোনো সাহিত্যিক কল্পনাও নয়।
এটি এক জীবন্ত ইতিহাস—মাটি, রক্ত, কষ্ট আর টিকে থাকার অদম্য লড়াইয়ের ইতিহাস।
আমি জেমস আব্দুর রহিম রানা। তবে অধিকাংশ মানুষ আমাকে রহিম রানা নামেই চেনে। যশোর জেলার মনিরামপুর উপজেলার মনোহরপুর ইউনিয়নের খাকুন্দি গ্রামের সন্তান। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে আমি তৃতীয়। আমার জীবন কোনো স্বাচ্ছন্দ্যের ছায়ায় শুরু হয়নি—এটি শুরু হয়েছে অভাবের অন্ধকার, সংগ্রামের কঠিন বাস্তবতা আর নীরব সহ্যশক্তির মাটিতে।
আমার বাবা দাউদ আলী বিশ্বাস ছিলেন এক সাধারণ মানুষ, কিন্তু তাঁর জীবন ছিল অসাধারণ এক নৈতিকতার পাঠশালা। তিনি কখনো অন্যের জমিতে দিনমজুরের কাজ করেছেন, আবার কখনো মাছের ব্যবসা করে সংসারের চাকা ঘুরিয়েছেন। তাঁর হাতে কোনো সম্পদ ছিল না, কিন্তু ছিল সততা—আর ছিল আত্মসম্মান, যা তিনি আমাদের উত্তরাধিকার হিসেবে দিয়ে গেছেন।
১৯৯০ সালের ৯ ডিসেম্বর, প্রায় ৮৭ বছর বয়সে তিনি নিজ বাড়িতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
সেই একটি মুহূর্ত শুধু একজন বাবার মৃত্যু ছিল না—এটি ছিল আমাদের জীবনের ভিত্তি ভেঙে পড়ার শব্দ।
সেদিন মনে হয়েছিল, ঘরের ছাদটা শুধু ভেঙে পড়েনি—পুরো পৃথিবীর আকাশটাই যেন আমাদের ওপর নেমে এসেছে।
আমি তখনও শিশুর সীমা পার করিনি, কিন্তু জীবন আমাকে হঠাৎ করেই বড় করে দিল।
যদিও বাবার মৃত্যুর আগেই আমাদের পরিবার ভাঙনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল। বড় বোন জীবন রক্ষার তাগিদে এবং পারিবারিক নির্যাতন ও অবহেলার কারণে বাধ্য হয়ে ভারতে চলে যান। ছোট বোন তখনও অর্ধশিশু, যদিও বয়সে আমার চেয়ে বড়। ছোট ভাই ছিল একেবারে দুগ্ধপোষ্য। আর মা—বয়স, ক্লান্তি আর জীবনের চাপ—সব মিলিয়ে ক্রমশ নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছিলেন।
এই পরিবারই ছিল আমার শৈশব।
আর সেই শৈশব শেষ হয়ে গেল খুব অল্প বয়সেই।
এরপর শুরু হলো দায়িত্বের জীবন—যেখানে স্বপ্ন নয়, টিকে থাকাই ছিল সবচেয়ে বড় যুদ্ধ।
বাবার মৃত্যুর পর আমরা যে বাস্তবতার মুখোমুখি হই, সেখানে কষ্ট শুধু একা ছিল না—তার সঙ্গে ছিল অবিচার, বঞ্চনা আর নীরব অপমানের ভার। আপনজনদের অত্যাচার এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে একসময় আমরা আমাদের বাবার শেষ চিহ্ন—তার কবরও রক্ষা করতে পারিনি।
একজন মুসলমানের মৃত্যুর পর তার সবচেয়ে পবিত্র স্মৃতি থাকে কবর। কিন্তু সেই স্মৃতিও একসময় মুছে যায় বাস্তবতার নির্মমতায়। সেই স্থানে গড়ে ওঠে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—খাকুন্দী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
আজও সেই বিদ্যালয় দাঁড়িয়ে আছে উন্নয়নের প্রতীক হয়ে। কিন্তু তার নিচে চাপা পড়ে আছে একটি পরিবারের ইতিহাস, একটি কষ্টের নাম, একটি নীরব বিলাপ।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো—সেই ইতিহাসের কোনো স্বীকৃতি নেই। নেই কোনো স্মরণ, নেই কোনো অবস্থান—এমনকি একটি অভিভাবক পরিচয়ের জায়গাও আমাদের ভাগ্যে জোটেনি।
পৈত্রিক সম্পত্তির গল্পও কম নির্মম নয়। পিতামহের রেখে যাওয়া কয়েক একর জমির মধ্যে আমার বাবার ভাগে আসে মাত্র ৬ শতাংশ। সেই সামান্য জমিই আজ আমাদের আশ্রয়—যেখানে আমরা দুই ভাই পরিবার নিয়ে বেঁচে আছি, প্রতিদিন মাটির সঙ্গে লড়াই করে।
আমাদের জীবন কোনো উন্নয়নের গল্প নয়—এটি টিকে থাকার গল্প।
বিধবা বড় বোন আজও তাঁর একমাত্র কন্যাসন্তানসহ ভারতে জীবন কাটাচ্ছেন। ছোট বোন নিঃসন্তান, তিনিও প্রায় পাঁচ বছর আগে স্বামীহারা হয়েছেন। যে পরিবার একসময় একসঙ্গে ছিল, সময়ের নির্মমতায় তা আজ ছিন্নভিন্ন বাস্তবতার মানচিত্র।
এই ছড়িয়ে পড়া সম্পর্কের ভেতরেই আমার বেড়ে ওঠা।
আমি খুব অল্প বয়সেই বুঝে গেছি—জীবন সহজ নয়, আর মানুষকে ভাঙার সুযোগও জীবন সবসময় দেয় না।
মা, ছোট ভাই আর ছোট বোনকে নিয়ে প্রতিটি দিন ছিল এক নীরব যুদ্ধ। যেখানে চিৎকার ছিল না, ছিল শুধু ধৈর্যের নিঃশব্দ সংগ্রাম।
তবুও আমি থেমে যাইনি।
আমি পড়াশোনা চালিয়ে গেছি, উচ্চশিক্ষার পথে হাঁটার চেষ্টা করেছি। কারণ আমি বিশ্বাস করি—শিক্ষা শুধু ডিগ্রি নয়; শিক্ষা মানুষের ভেতরে আত্মসম্মান তৈরি করে, আর সেই আত্মসম্মানই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে।
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে একসময় আমি লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হই। মানুষের জীবন, সমাজের অসাম্য, অবহেলিত মানুষের কণ্ঠ—এসব তুলে ধরতে গিয়ে আমি নিজের ভেতরে নতুন এক পরিচয় খুঁজে পাই। কলম তখন আর শুধু লেখা নয়; এটি হয়ে ওঠে সত্যের দায়িত্ব।
আমার মা আজ প্রায় ১১৬ বছরের এক জীবন্ত ইতিহাস। বাবার মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স ছিল প্রায় ৮০ বছরের কাছাকাছি। সময় তাঁর শরীরকে দুর্বল করেছে, কিন্তু মনকে ভাঙতে পারেনি। আজও তিনি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি, সবচেয়ে নীরব আশ্রয়।
কিন্তু জীবনের সবচেয়ে গভীর আঘাত এসেছে সম্পর্কের ভেতর থেকেই।
যে ছোট ভাইকে আমি নিজের সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে বড় করেছি, আজ সে বড় হয়ে অনেক কিছু ভুলে গেছে। সময়ের সঙ্গে সম্পর্কের ভাষা বদলে গেছে। ভালোবাসার জায়গায় এসেছে দূরত্ব, আর সেই দূরত্বই আমার জীবনের সবচেয়ে নিঃশব্দ বেদনা।
জীবনে চলার পথে অনেক মানুষ এসেছে। কেউ কথা দিয়েছে, কেউ পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে, কেউ স্বপ্ন দেখিয়েছে। কিন্তু সময়ের পরীক্ষায় অনেকেই হারিয়ে গেছে। আপনজনের কাছ থেকেও অবহেলা পেয়েছি। কখনো বিশ্বাস করেছি, কখনো ভেঙে পড়েছি, আবার নিজেকেই গুছিয়ে দাঁড় করিয়েছি।
জীবনের এক দীর্ঘ অধ্যায়ে—প্রায় ১৪ বছরের একটি সম্পর্ক—শেষ পর্যন্ত ভেঙে গেছে স্বার্থ আর বাস্তবতার দেয়ালে। সেই ভাঙন আমাকে ভেতর থেকে কষ্ট দিয়েছে, কিন্তু বাইরে থেকে আমাকে নীরব করে দিয়েছে। আমি শিখেছি—সব সম্পর্ক টিকে থাকে না, কিন্তু সব অভিজ্ঞতা মানুষকে বড় করে।
তবুও আমি থামিনি।
কারণ আমার থামার কোনো সুযোগ ছিল না।
তারপরও আমি কাউকে দোষ দিই না।
কারণ আমি বুঝেছি—সব মানুষ একইভাবে ভালোবাসতে জানে না, আর সব সম্পর্ক একইভাবে টিকে থাকে না।
আমি ধনী নই, বিলাসিতার জীবনও আমার নেই। কিন্তু আমার আছে নিজের প্রতি সম্মান—আর সেটাই আমার সবচেয়ে বড় সম্পদ।
গভীর রাতে যখন আমি নিজের জীবনের দিকে তাকাই, তখন কোরআনের একটি আয়াত হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হয়—
“নিদর্শন আছে তোমাদের নিজেদের মধ্যেও, তোমরা কি দেখো না?”
মানুষ নিজেই এক বিস্ময়।
এক ফোঁটা তুচ্ছ উপাদান থেকে আল্লাহ সৃষ্টি করেন পূর্ণ এক জীবন—স্বপ্ন, অনুভূতি, ভালোবাসা আর বেদনায় ভরা এক পৃথিবী।
এই উপলব্ধিই আমাকে প্রতিদিন বিনয়ী করে।
আজ আমি পিছনে তাকালে কেবল কষ্ট দেখি না—আমি দেখি গড়ে ওঠার গল্প।
আমি দেখি শিক্ষা।
আমি দেখি সহ্যশক্তি।
আমি কখনো নিজের পরিচয় লুকাতে চাই না। কারণ কৃষকের ঘরে জন্ম নেওয়া বা দিনমজুরের সন্তান হওয়া কোনো লজ্জা নয়—এটি সংগ্রামের পরিচয়, এটি শ্রমের ইতিহাস।
আজকের পৃথিবীতে অনেকে নিজের শেকড় ভুলে যেতে চায়। কিন্তু ইতিহাস বলে—মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব কখনো জন্মে নয়, বরং সংগ্রামে তৈরি হয়।
আমি তাই গর্ব করে বলি—
আমি কৃষকের সন্তান।
আমি দিনমজুরের সন্তান।
আমি খাকুন্দির মাটির মানুষ।
এই মাটির গন্ধই আমাকে আজও মানুষ হয়ে বাঁচতে শেখায়—নিঃশব্দে, দৃঢ়ভাবে, মাথা উঁচু করে।
লেখক পরিচিতি:
জেমস আব্দুর রহিম রানা।
(সিনিয়র গণমাধ্যমকর্মী, সাহিত্যিক ও কলামিস্ট)
ঠিকানা: ৪১২, মরহুম দাউদ আলী রোড, খাকুন্দি, মনোহরপুর ইউনিয়ন, মনিরামপুর, যশোর।
মোবাইল: ০১৩০০৮৩২৮৬৮